রোহিঙ্গা খুনি দুলাভাই গ্রেফতার

প্রায় ১৫ বছর আগে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ঘোনারপাড়ায় এক বাড়িতে অবস্থান নেন। ২০১৫ সালে স্থানীয় হামজার ডেইল এলাকায় একখন্ড জমি ক্রয়ের পর জমিটির মালিকানায় শাশুড়ির নাম দেয়ার শর্তে মামুনপাড়ার মৃত আব্দুর রহমানের মেয়ে শফিকাকে বউ হিসেবে পায় রশিদ।

শর্তমতো শাশুড়িকে তার কেনা জমির অংশিদার করেও বউয়ের গর্ভ নষ্ট করে তাকে কেড়ে নিয়ে স্বজনদের মাধ্যমে বার বার মারধর করায় প্রতিশোধ নিতেই টমটম চালক শ্যালককে নির্জন তোতকখালী নিয়ে ছুরিকাঘাতের পর ব্যাটারির এসিড মিশ্রিত পানি দিয়ে মুখ ও শরীর ঝলসে দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর রাতে সংঘটিত টমটম চালক কিশোর রমজান হত্যার বিষয়ে এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছে হত্যাকারি রোহিঙ্গা রশিদ। ক্লো-লেস রমজান হত্যার দু’বছর ৪ মাসের মাথায় সোমবার (১৬ মার্চ) ভোর রাতে চট্টগ্রামের কোতোয়ালী এলাকা থেকে কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর সন্ধ্যায় জেলা ডিবি কার্যালয়ে রশিদ শ্যালককে হত্যার লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি দিয়েছে। এমনটি জানিয়েছেন, ক্লো-উদ্ধার ও গ্রেফতার অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া কক্সবাজার জেলা ডিবির ইন্সপেক্টর মানস বডুয়া।

ওসি মানস বড়ুয়া জানান, কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ইউনিয়নের তোতকখালীর ধানী জমি থেকে ছুরিকাঘাত ও এসিডে ঝলসে যাওয়া রমজান (১৪) নামের এক কিশোরের মরদেহ ২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর উদ্ধার করেছিল সদর থানা পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত কিশোরের মা ফাতেমা বেগম বাদি হয়ে পরের দিন (৩ ডিসেম্বর) সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু কাউকে ঘটনার জন্য দায়ি করতে পারায় এজাহারেও কোন আসামির নাম উল্লেখ ছিল না।

পুলিশ পরিদর্শক মানস বড়ুয়া আরো বলেন, মামলাটি দীর্ঘ তদন্ত করেও কোনো কুল-কিনারা করতে পারেনি থানা পুলিশ। পরে ২০১৯ সালের শেষের দিকে মামলাটি জেলা গোয়েন্দা পুলিশে হস্তান্তর হয়। থানা থেকে হস্তান্তরের পর মামলাটি নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান করা হয়। এরই একপর্যায়ে উঠে আসে নিহত রমজানের দুলাভাই আব্দুর রশিদের নাম। পরে প্রযুক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানা এলাকায় অবস্থান নিশ্চিত হয়ে রোববার দিনগত রাতে (সোমবার ১৬ মার্চ ভোররাতে) রোহিঙ্গা আব্দুর রশিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর কক্সবাজার কার্যালয়ে নিয়ে আসার পর হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি বর্ণনা দেন রশিদ।

জবানবন্দিতে আব্দুর রশিদ উল্লেখ করেন, প্রায় ১৫ বছর পূর্বে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে খুরুশকুল ঘোনারপাড়ায় তার পরিচিত আব্বাস নামে এক ভাইয়ের বাড়িতে অবস্থান নেয়। সেখানে অবস্থানকালীন ২০১৫ সালের দিকে হামজার ডেইল এলাকায় একটি জায়গাও কেনা হয়। জায়গা নেয়ার পর খুরুশকুল মামুন পাড়ার মৃত আব্দুর রহমানের মেয়ে শফিকাকে বিয়ে করে তাদের বাড়িতে বসবাস শুরু হয়। বিয়ের শর্ত ছিল, কেনা জমির দলিলে শাশুড়িকেও অংশিদার করা হবে। বিয়ের ১১ মাসের মাথায় শাশুড়ির শর্ত পূরণ করে জায়গাটির দলিল করেন রশিদ।

তিনি আরো বলেন, জমি দলিল সম্পন্ন হওয়ার সময় শফিকাকে বিয়ের ১১ মাস পূর্ণ হয় ও স্ত্রী তখন চার মাসের অন্তঃসত্তা। কিন্তু জমির মালিকানা পেয়ে শাশুড়ির তার রূপ পাল্টান। মেয়েকে জোর করে গর্ভের সন্তানটি নষ্ট করায়।’

‘এ নিয়ে রশিদ ও শফিকার মাঝে পারিবারিক কলহ শুরু হয়। ঝগড়ার একপর্যায়ে রশিদকে মারধর করে শশুড় বাড়ির লোকজন। এই নিয়ে স্থানীয় বিচার শালিসও হয়। বিচারে উল্টো রশিদকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এক পর্যায়ে শফিকার সাথে তার (রশিদের) বিয়ে ভেঙে যায়। শালিসে ধার্য্য থেকে শাশুড়িকে ১৩ হাজার নগদ এবং বিভিন্ন সময় মাছ সরবরাহ করে পুরো টাকা শোধ করে রশিদ। টাকা পরিশোধের পর শাশুড়ির কাছ থেকে জমির কাগজ ফেরত চেয়ে উল্টো লাঞ্ছিত হন রশিদ। সালিশ কারক জমির উদ্দিনের শরনাপন্ন হন রশিদ।’

‘কিন্তু জরিমানার টাকা তাকে না দিয়ে শাশুড়িকে দেয়ায় জমির দলিল নিয়ে দেয়ার পরিবর্তে রশিদকে ধরে নিয়ে উল্টো মারধর করেন জমির উদ্দিন। বারবার মারধরের শিকার হয়ে মনে মনে প্রতিশোধ নেয়ার শপথ নেন রশিদ। ঘটনার মাসখানেক পর (২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর) বিকালে শ্যালক রমজানকে শহরের খুরুশকুল রাস্তার মাথায় টমটমসহ দেখতে পান রশিদ। রশিদ শ্যালক রমজানকে টমটম নিয়ে রিজার্ভ খুরুশকুল তোতকখালী পৌঁছে দিতে বলেন।’

রশিদ আরো উল্লেখ করেন, তোতকখালী যেতে রাজি হওয়ার পর শহরের টেকপাড়া থেকে মদ পান করে রশিদ। এরপর টমটমে উঠে চলার পর তোতকখালীর একটি নির্জন জায়গায় টমটম দাঁড় করিয়ে শ্যালক রমজানকে প্রহার শুরু করে। রমজানও পাল্টা আঘাত করে। একপর্যায়ে ধারালো ছুরি দিয়ে রমজানের হাত ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হলে জমিতে পড়ে যায় রমজান। এরপরই টমটমের ব্যাটারির এসিড মাখা পানি রমজানের সারা শরীর ঢেলে দেয়। এতে তার মুখ ঝলসে যায়। শ্যালকের মৃত্যু নিশ্চিত করে টমটম নিয়ে শহরে ফিরে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে চলে যান রোহিঙ্গা আব্দুর রশিদ। সেখান থেকে ফিরে চট্টগ্রামে বাস করা শুরু করেছেন তিনি এবং সেখান থেকেই ডিবি পুলিশ তাকে আটক করে।

ওসি মানস বড়ুয়া বলেন, যেহেতু হত্যার স্বীকারোক্তি অপকটে দিয়েছেন খুনি সেহেতু মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) রশিদকে খুনি আসামি হিসেবে কক্সবাজারের সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রেরণ করা হবে।

এদিকে, একটি ক্লো-লেস মামলার ক্লো উদঘাটন করায় ডিবি পুলিশকে সাধুবাদ জানাচ্ছে সচেতনমহল। আবার মায়ের লোভের কারণে কিশোরের প্রাণনাশের তথ্যটি প্রচার পাওয়ায় লোভী মায়ের প্রতি ধিক্কার জানাচ্ছেন সবপেশার মানুষ।

 spankbang