সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি পাহাড়ে অবৈধ ঘরবাড়ি

নিজস্ব প্রতিবেদক :
নগরীর বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন লক্ষাধিক মানুষ। পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য প্রশাসন নির্দেশ দিলেও সরছে না তারা। কয়েকবার উচ্ছেদ করার পরও তারা এখনো পাহাড়েই ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরের মতিঝর্ণাসহ বিভিন্ন পাহাড়ে কয়েকটি সিন্ডিকেট পাহাড়ে ঘর তুলে গরীব মানুষদের কাছে ভাড়া দেয়। অন্যান্য জায়গার চেয়ে এখানে বাসা ভাড়া কম হওয়ায় তারাও দিনের পর দিন ঝুঁকি নিয়ে এসব পাহাড়ে বসবাস করে চলেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মতিঝর্না এলাকায় পাহাড় দখলের নেতৃত্বে আছে আলী আরমান তাহসিন নামের এক যুবক। স্থানীয় আলী আজগরের ছেলে তাহসিন নিজেকে ছাত্রলীগের কর্মী বলে পরিচয় দেয়। তবে ওয়ার্ড কিংবা থানা ছাত্রলীগ কমিটিতে তার কোন পদবী নেই। তার সাথে আরো আছে স্থানীয় যুবদল নেতা সালাউদ্দিন সরওয়ার। এরা দু’জনই এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সাথে জড়িত। সালাউদ্দিনের নামে হরতালে গাড়ি পোড়ানো ও নাশকতার অভিযোগও আছে। বিগত কয়েক বছর ধরে পাহাড়ের অবৈধ ঘরগুলো থেকে তারা ভাড়া আদায় করে আসছে।
এদিকে, পাহাড়ে বসবাসকারীরা বলছেন, আমরা টাকা দিয়ে জমি কিনে এখানে ঘর তৈরি করেছি। এছাড়া কম টাকায় বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পাওয়ায় অনেকে এসব স্থানে ভাড়া বাসায় থাকেন। এখান থেকে সরে আমরা কোথায় যাবো। সরকার যদি অন্য কোথাও পুনর্বাসন না করে তবে আমরা এখান থেকে সরব না। প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, কিছুদিন পরই মৌসুমী বৃষ্টি শুরু হবে। তখন প্রবল বর্ষণের ফলে পাহাড় ধসে প্রাণহানি হতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে এবং নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রামের পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, শুধু বর্ষা এলে তড়িঘড়ি করে কিছু বসতি উচ্ছেদ করা হলেও সারা বছর প্রশাসনের কোন খবর থাকে না। এছাড়া উচ্ছেদকারীদের পুনর্বাসন না করা এবং যথাযথ তদারকির অভাবে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বন্ধ করা যাচ্ছে না।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বর্তমানে নগরীর ১১টি পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ৬৬৬টি পরিবার বসবাস করছে। এর মধ্যে নগরীর একে খান মালিকানাধীন পাহাড়ে ১৮৬ পরিবার, ইস্পাহানি পাহাড়ের দক্ষিণ পাশে হারুন খানের পাহাড় ও বায়তুল আমান সোসাইটির কাছে পাহাড়ে ৫টি, কৈবল্যধাম বিশ্ব কলোনি পাহাড়ে (পানির ট্যাংক) ২৭টি, লেকসিটি আবাসিক এলাকার পাহাড়ে ১২টি, আকবর শাহ আবাসিক এলাকা পাহাড়ে ২২টি, পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে সিটি কর্পোরেশন পাহাড়ে ১১টি, ফয়েজ লেক আবাসিক এলাকার কাছে পাহাড়ে ৯টি, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট অ্যাকাডেমির উত্তর পাশে মীর মোহাম্মদ হাসানের মালিকানাধীন পাহাড়ে ৩৮টি, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা সংলগ্ন পাহাড়ে ৩টি, জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটি সংলগ্ন পাহাড়ে ৩৩টি, মতিঝর্ণা ও বাটালি হিল পাহাড়ে ৩২০টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। এ ১১টি পাহাড় ছাড়াও আরো ১৪টি পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে। তবে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, সরকারি পরিসংখ্যানের তুলনায় পরিবারের সংখ্যা অনেক বেশি।
পাহাড়গুলোর পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে কমপক্ষে লক্ষাধিক মানুষ। মতিঝর্ণা, বাটালি হিল, খুলশী, লালখান বাজার, পাহাড়তলী, টাইগার পাস, আমবাগান, বাটালি হিল রেলওয়ে কলোনি, পাহাড়তলী রেল কলোনি, বায়েজিদ বোস্তামি, হাটহাজারী উপজেলার ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী সিটি কর্পোরেশন ওয়ার্ডের শাহ আমানত কলোনি, জঙ্গল পাহাড়তলী, কাছিয়াঘোনা, লেবু বাগান, ভাটিয়ারীসহ সীতাকু-ের সলিমপুর, লতিফপুর ও রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় এসব মানুষের বসবাস।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াছ হোসেন বলেন, ‘পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ অভিযানের জন্য তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ফণীর সময় মতিঝর্নাসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটরা বাধার মুখে পড়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এক হয়ে সরকারি কাজে বাধা দিয়েছে।
পুনর্বাসনের ব্যাপারে মোহাম্মদ ইলিয়াছ হোসেন বলেন, এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। তাই বর্ষা মৌসুমে প্রাণহাণি বন্ধ করতে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো উচ্ছেদ করা হবে। পাহাড় ধস রোধে সরকার, রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দেন তিনি।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ও দেওয়াল ধসে গত ৮ বছরে প্রায় ২০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জুন স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধসে চট্টগ্রামে ১২৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট লালখানবাজারের মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড় ধসে মারা যান ১১ জন, ২০০৯ ও ২০১০ সালে নগরীর পাহাড়তলী, সিআরবি, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে মারা যান আরও ১৫ জন। ২০১১ সালের ১ জুলাই পাহাড় ধসে একই পরিবারের ৮ জনসহ বাটালি পাহাড়ের রিটেইনিং দেয়াল ধসে ১৭ জন মারা যান। ২০১২ সালে ১৭ জুন নগরীর ফিরোজ শাহ কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকায় ২৩ জন মারা গেছেন। ২০১৩ সালে পাহাড় ও দেয়াল ধসে মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ৫ জনের। টানা বৃষ্টিপাত হলে এবারও ব্যাপক প্রাণহানির আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০০৭ সালে পাহাড় ধসের ঘটনার পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে একটি কমিটি ২৮টি কারণ নির্ধারণ করে ৩৬টি সুপারিশ প্রণয়ন করে। তবে সুপারিশগুলো আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

 spankbang