চিরবিদায় মুক্তিযোদ্ধা রমা চৌধুরী

 

একাত্তরের জননী’ খ্যাত বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী আর নেই। সোমবার ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা আর ফুলেল শ্রদ্ধায় চির নিদ্রায় শায়িত হলেন এই বীরাঙ্গনা। গতকাল সোমবার বিকাল ৫টার দিকে বোয়ালখালীর পোপাদিয়া গ্রামে ছেলে দীপংকর টুনুর সমাধির পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনসহ বিশিষ্টজনেরা।
গত রবিবার সন্ধ্যার দিকে রমা চৌধুরীর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। রাতেই তাকে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হয়। কিন্তু কোনো চেষ্টাই কাজে আসেনি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় ৭৭ বছরের বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরীর। তিনি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন জটিল রোগ নিয়ে গত জানুয়ারি থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
বিকাল ঠিক ৫টা। চারিদিকে নিরবতা। মাইকে কখনও মন্ত্রপাঠ, কখন ঢাক–ঢোলে নিরবতা ভাঙ্গছে। সনাতনি ধর্মালম্বীদের চিরাচরিত নিয়ম ঠিক রাখা হয়েছে প্রার্থনায়। তবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় তাঁর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী ভিন্নতা। চিতায় আগুনের বিপরীতে কবর খোঁড়া হয়েছে তাঁর অতিপ্রিয় ছেলে দীপঙ্কর টুনু’র সমাধির পাশে। পুরোহিত মন্ত্রপাঠ শেষে স্বজন, প্রশাসন, সাহিত্যপ্রেমিক, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আর জনপ্রতিনিধির উপস্থিতিতে চির শয়ানে রাখা হয় আজীবন সংগ্রামী নারী রমা চৌধুরীকে। এ যেন একটি সংগ্রামের অবসান। এর আগে দুপুরে বোয়ালখালী উপজেলা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাঁর শবদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। বিকেল সাড়ে ৩টায় গ্রামের বাড়িতে এ মহীয়সী নারীর শবদেহ পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান ও বিউগলের করুণ সূর মৃত্যুকে আরো বেদনাময় করে তুলে। এসময় উপস্থিত ছিলেন এডিশনাল এসপি (পটিয়া সার্কেল) জসিম উদ্দিন খান, ইউএনও বোয়ালখালী আছিয়া খাতুন, অফিসার ইনচার্জ (ভারপ্রাপ্ত) মাহবুবুল আলম আখন্দ, স্থানীয় চেয়ারম্যান এস এম জসিম উদ্দিন, বিএলএফ কমান্ডার রাজেন্দ্র প্রাসাদ চৌধুরী, উপজেলা আ. লীগ সাধারণ সম্পাদক জহিরুল আলম জাহাঙ্গীর, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. হারুন মিয়া, মুক্তিযোদ্ধা এস এম সেলিম, জহুরুল ইসলাম জহুর, বিশ্বজিৎ বিশ্বাস বাপ্পী, মিজানুর রহমান সেলিমসহ বিভিন্ন স্কুল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এর আগে সকাল ১০টার দিকে তার মরদেহ নগরীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়া হয়। সেখানে ফুলে ফুলে রমা চৌধুরীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান সর্বস্তরের মানুষ। দুপুর একটার দিকে রমা চৌধুরীর মরদেহ নিয়ে বোয়ালখালীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন তার স্বজনেরা। বীরাঙ্গনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন দক্ষিণ জেলা আ.লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন আহমদ, নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মহানগরের কমান্ডার মোজাফফর আহমদ, সিএমপি অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমান, শহীদজায়া মুশতারি শফী, মুক্তিযোদ্ধা অমল মিত্র, অধ্যক্ষ রীতা দত্ত, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব যুগ্ম সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ, ভারপ্রাপ্ত সিটি মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, নগর বিএনপির সহ–সভাপতি আবু সুফিয়ান, নগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু, চসিক কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী, শৈবাল দাশ সুমন, সিএমপির উপ–পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেন, কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসীন, নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু, জেলা শিল্পকলা একাডেমি পরিচালনা কমিটির সহ–সভাপতি রনজিৎ রক্ষিত, সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বাবু, উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সহ–সভাপতি ডা. চন্দন দাশ, সিপিবি চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক অশোক সাহা, ওয়াকার্স পার্টি চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক শরীফ চৌহান প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, ১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর বোয়ালখালী উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন রমা চৌধুরী। তিনি ১৯৭১ সালের ১৩ মে তিন শিশু সন্তান নিয়ে পোপাদিয়ায় গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। তখন স্বামী ছিলেন ভারতে। এদিন পাক হানাদার বাহিনী তাদের ঘরে হানা দেয়। নিজের মা আর ৫ বছর ৯ মাস বয়সী ছেলে সাগর ও ৩ বছর বয়সী টগরের সামনেই এক পাকিস্তানি সৈনিক রমা চৌধুরীকে ধর্ষণ করে। পুড়িয়ে দেয়া হয় তার ঘর–বাড়ি। পরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে নির্যাতিত হয়ে সমাজের লাঞ্ছনা এবং ঘরবাড়ি হারিয়ে রমা চৌধুরী অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন। তবু জীবনযুদ্ধে হার মানেননি এ বীরাঙ্গনা। শুরু করেন নতুনভাবে পথচলা। ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর অনাহারে–অর্ধাহারে অসুস্থ হয়ে মারা যায় বড় ছেলে সাগর। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সন্তান টগর মারা যায়। তৃতীয় সন্তান টুনু ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। পেশা হিসেবে জীবনে তিনি শিক্ষকতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। সংগ্রামী এ আত্মপ্রত্যয়ি নারী ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৮সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে শিক্ষকতা জীবনের অবসান ঘটান। পরবর্তীতে আশির দশকের মাঝামাঝি নিজের লেখা বই রমা চৌধুরী ফেরি করে বিক্রি শুরু করেন। ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত তিনি খালি পায়ে রাস্তায় হেঁটে হেঁটে বই বিক্রি করে গেছেন। এরপর শারীরিক শক্তি হারাতে শুরু করেন। ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর বাসায় পড়ে গিয়ে রমা চৌধুরী কোমরে গুরুতর আঘাত পান। ওইদিনই তাকে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেই যে বিছানায় শয্যাশায়ী হন তিনি। কোমরের আঘাত, গলব্লাডার স্টোন, ডায়াবেটিস, অ্যাজমাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি রমা চৌধুরী ভর্তি হন চমেক হাসপাতালে। এরপর থেকে সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শবদেহ পোড়ানোতে বিশ্বাস করতেন না রমা চৌধুরী। তাই তিন সন্তানকেই দেয়া হয়েছে মাটিচাপা। মুক্তিযুদ্ধের পর টানা চার বছর জুতো পড়েননি রমা চৌধুরী। এরপর নিকটজনের পীড়াপিড়িতে অনিয়মিতভাবে জুতো পড়া শুরু করলেও তৃতীয় সন্তান মারা যাবার পর আবার ছেড়ে দিয়েছেন জুতো পায়ে দেয়া। এরপর গত ১৫ বছর ধরে জুতো ছাড়াই পথ চলছেন রমা চৌধুরী।
চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালে মনের মধ্যে প্রবল আশা নিয়ে বলেছিলেন–তিনি পুরো বাংলাদেশ ঘুরতে চান। তার লেখা বই ‘একাত্তরের জননী’র আরও নয়টি খ– বের করতে চান। তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল গোটা বাংলাদেশ ভ্রমন করা। সারাদেশের পর পুরো পৃথিবী ঘুরার ইচ্ছে ছিল তার।
জীবনযুদ্ধে হার না মানা এই মহিয়সী নারী একে একে লিখে ফেলেন ‘একাত্তরের জননী’, ‘এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য’ এবং ‘ভাব বৈচিত্রে রবীন্দ্রনাথ’ সহ ১৮টি বই। এসব বই বিক্রি করেই চলতো তার সংসার। রমা চৌধুরীর দীর্ঘদিনের সহচর ও তার বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দীন খোকন বলেন, রমা চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীল। খুব সাদামাটা জীবনযাপন করতেন তিনি। আমার খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।
একাত্তরের বীরাঙ্গনা ও লেখিকা রমা চৌধুরী’র মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এম. এ সালাম, চসিকের ভারপ্রাপ্ত মেয়র চৌধরী হাসান মাহমুদ হাসনী, শহীদ জায়া মুশতারী শফী, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান, এমইএস কলেজ এর অধ্যক্ষ মোহাম্মদ রেজাউল করিম চৌধুরী, কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস আরশেদুল আলম বাচ্চু, কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি হাবিবুর রহমান তারেক, সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াছ উদ্দীন, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদ সুমন, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম চট্টগ্রাম বিভাগীয় সদস্য সচিব বেদারুল আলম চৌধুরী বেদার, মহানগর সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম মন্টু, সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা ডা. সরফরাজ খান চৌধুরী বাবুল, এডভোকেট বি. কে বিশ্বাস বিপ্লব, নুরে আলম সিদ্দিকী, লেডিস ক্লাব সভানেত্রী খালেদা আউয়াল ও সম্পাদিকা বোরহানা কবির, লেখিকা সংঘের সভানেত্রী ড. আনোয়ারা আলম, সম্পাদিকা জিনাত আজম

 spankbang