অর্থনীতিতে হোমবেইজড শ্রমিকের অবদান

নন্দন রায়, সীতাকু- প্রতিনিধি:
হোমবেইজড বা গৃহভিত্তিক শ্রমিক কথাটা এদেশে নতুন হলেও অন্যান্য দেশে কথাটা বেশ পুরাতন। হোমবেইজড শ্রমিকরা হচ্ছেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক যারা নিজ বাসাবাড়িতে কন্ট্রাকটর বা সাপ্লায়ারের কার্যাদেশ অনুযায়ী কাজ করেন। কাজের ধরণের মধ্যে আছে – পোশাকে নকশা, সেলাই, কারচুপির কারুকাজ, এমব্রয়ডারি, বোতাম তৈরি, টেইলরিং, লেবেল তৈরি ইত্যাদি। তৈরি পোশাক শিল্প ও টেক্সটাইল সাপ্লাই চেইনে অতি সামান্য মজুরিতে ঘরে বসে কাজগুলো করে থাকেন বলে বিশ^ব্যাপী এদের নাম হোমবেইজড শ্রমিক বা হোমওয়ার্কার। হোমবেইজড শ্রমিক বা গৃহভিত্তিক শ্রমিককে অনেকেই গৃহকর্মীর সাথে গুলিয়ে ফেলেন। গৃহকর্মীরা অন্যের বাসায় গৃহস্থালির কাজ করেন। যাদের আমরা কাজের বুয়া বা গৃহপরিচারিকা হিসেবে জানি। অন্যদিকে গৃহভিত্তিক শ্রমিক বা হোমবেইজড শ্রমিকরা কাজ করেন নিজ বাসায়। তারা সাধারণত রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকের বোতাম তৈরি, এমব্রয়ডারি, ব্লক-বুটিক, পুথির কারুকাজ ও নকশা করেন। হোমবেইজড শ্রমিকরা গার্মেন্ট শ্রমিকদের মতো কোনো ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন না। এই শ্রমিকরা মূলত টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট সাপ্লাই চেইন থেকে এজেন্টের হাত ঘুরে আসা বিভিন্ন কাজের অর্ডার অনুযায়ী কাজ করেন। তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল সাপ্লাই চেইনে এদের অবদান অনেকটাই দৃষ্টির আড়ালে ঢাকা। তাই প্রাতিষ্ঠানিক গার্মেন্ট শ্রমিকদের চেয়েও এরা অনেক কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হন। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০ কোটি হোমবেইজড শ্রমিক রয়েছে যার মধ্যে ৫০ শতাংশের অবস্থান বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। এদের ৮০ শতাংশই নারী শ্রমিক। এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের অধিকার সংরক্ষণের জন্য শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্তি এবং প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। হোমবেইজড শ্রমিকদের থেকে বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো সস্তাশ্রমে কাজ করিয়ে নিলেও তাদের প্রতি দায়বোধ দেখানোর প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন না। এসব শ্রমিকের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা অনেক বেশি উপেক্ষিত। শ্রমিকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা না থাকায় মহাজন ও মালিকশ্রেণির শোষণের শিকার হচ্ছে। সরকারিভাবে এদের জন্য কোন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও নেই। সমাজে এরা আর্থিকভাবে অনেক বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। সবসময় কাজ পাওয়া যায় না আবার কাজ পেলেও অতি সামান্য মজুরির জন্য টানা খাটুনীতে ভেঙ্গে পড়া হতোদ্যম এসব শ্রমিকের কথা আমাদের অজানাই থেকে গেছে। ২০০৯-১০ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরো পরিচালিত সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ২০ লাখ হোমবেইজড শ্রমিক রয়েছে যাদের অধিকাংশই নারী। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতে ৩ কোটি ৭০ লাখ (২০১১-১২ সালের হিসাব অনুযায়ী), নেপালে ৯ লাখ ২০ হাজার (২০০৮) এবং পাকিস্তানে ১৪ লাখ ৩০ হাজার (২০০৮-৯) হোমবেইজড শ্রমিক রয়েছে। ১৯৯৬ সালের ৮৩ তম ইন্টারন্যাশনাল লেবার সম্মেলনে হোমইেজড শ্রমিকদের জন্য আইএলও কনভেনশন ১৭৭ গৃহীত হয়। এ পর্যন্ত ফিনল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, আলবেনিয়া, নেদারল্যান্ডস, আর্জেন্টিনা, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, বেলজিয়াম, তাজাকিস্তান, ম্যাসেডোনিয়া এবং বুলগেরিয়া আইএলও কনভেনশন ১৭৭ অনুসমর্থন করেছে কিন্তু দক্ষিণ এশিয়া বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে কোনো দেশই কনভেনশন ১৭৭ অনুসমর্থন করেনি।বাংলাদেশ সরকার কনভেনশনটি অনুসমর্থন করলে হোমবেইজড শ্রমিকরা বেশকিছু ক্ষেত্রে সুরক্ষা পাবে। এর মধ্যে আছে – কর্মক্ষেত্রে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং সমান সুযোগ লাভের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, ন্যায্য মজুরি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, কাজে নিযুক্ত হওয়ার সর্বনি¤œ বয়স ইত্যাদি। বাংলাদেশ অক্যুপেশনাল সেইফটি, হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ফাউন্ডেশন (ওশি)র চেয়ারপার্সন সাকি রিজওয়ানা বলেন, সরকার কনভেনশনটি অনুস্বাক্ষর করলে হোমবেইজড শ্রমিকের আইনি স্বীকৃতির বিষয়টি অনেকাংশে এগিয়ে যাবে। কনভেনশনের ধারা ৩ ও ৪ অনুযায়ী, যেসব সদস্য রাষ্ট্র এই কনভেনশনটি অনুসমর্থন করবে তারা হোমওয়ার্কের ওপর একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করবে। এই নীতিমালা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে দেশগুলো নির্দিষ্ট সময় অন্তর নীতিমালার পর্যালোচনা করবে। এই প্রক্রিয়ায় সদস্য রাষ্ট্রগুলো হোমওয়ার্কারদের নিয়ে কাজ করছে এমন প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন এবং হোমওয়ার্কারদের সংগঠন-সমিতি বা শ্রমিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করবে। হোমওয়ার্কারদের জন্য প্রণীত জাতীয় নীতিমালায় শ্রমিকরা যতদূর সম্ভব অন্যান্য বেতনভোগী কর্মীদের মতো সমানভাবে বিবেচিত হবেন। তিনি বলেন, হোমওয়ার্কারদের কাজের বিশেষ ধরন আমলে নিয়ে অন্যান্য যেসব কাজের ধরন এর সাথে মিলে যায় সেগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্যান্য পেশার সাথে বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে বিশেষভাবে যে বিষয়গুলোতে নজর দিতে হবে তা হলো- ১. হোমওয়ার্কারদের স্ব-ইচ্ছায় সংগঠন করার অধিকার এবং এ ধরনের যেকোনো সংগঠনে যোগ দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা; ২. নিযুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া এবং পেশায় বৈষম্য থেকে সুরক্ষিত রাখা; ৩. পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের সুরক্ষা; ৪. পারিশ্রমিক; ৫. বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভূক্তি; ৬. প্রশিক্ষণের অধিকার; ৭. কাজে নিযুক্ত হওয়ার ন্যূনতম বয়স এবং ৮. মাতৃত্বকালীন সুযোগ-সুবিধা ও অধিকারের সংরক্ষণ। সরকার সম্প্রতি শ্রম আইন ২০০৬ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। মূলত গার্মেন্টস শিল্পের কথা ভেবে এই উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে দেশের তৈরি পোশাক পণ্যের বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে পাওয়া জিএসপি সুবিধা স্থগিত হয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় শ্রম আইন সংশোধনে রাজি হয় সরকার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আইএলও-র পরামর্শে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সহজতর করা, নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে ৩০ শতাংশ শ্রমিকের প্রতিনিধিত্বের নিয়ম শিথিল করা, ইপিজেডে শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার প্রদান, রেজিস্ট্রেশন পেতে হয়রানি দূর করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ইত্যাদি বিষয়ে নমনীয়তা দেখায় সরকার। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এসব উদ্যোগের সবকিছুই তৈরি পোশাক শিল্প এবং প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কথা ভেবে করা হচ্ছে। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র তথ্য অনুযায়ী সারাদেশের ৪ হাজার ৪৮২ টি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করেন মোট ৪০ লাখ শ্রমিক। অন্যদিকে গার্মেন্ট সাপ্লাই চেইনে যুক্ত রয়েছে ২০ লাখ হোমবেইজড শ্রমিক। কিন্তু তাদের ব্যাপারে কেউ ভাবছে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আইনুন নাহার বলেন, দেশ-বিদেশের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো সস্তা মজুরিতে হোমবেইজড শ্রমিকদের থেকে পণ্য-সামগ্রী উৎপাদন করে দেশ-বিদেশে বেশি দামে বিক্রি করে। অথচ উৎপাদনকারী শ্রমিকদের সামান্য মজুরি প্রদান করে, মাসের পর মাস মজুরি আটকে হয়রানি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারকে প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও আইন প্রণয়নের ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে যাতে শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ও ক্রেতা কেউই যেন হোমবেইজড শ্রমিকদের প্রাপ্য অধিকারের দায় এড়িয়ে না যান সেটাই কাম্য। বাংলাদেশ সরকার প্রণীত জাতীয় শ্রমনীতি, ২০১২-তে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের ব্যাপারে বলা হয়েছে – ‘দেশের মোট শ্রমশক্তির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। যার মধ্যে রয়েছে- কৃষি, নির্মাণ, গৃহ, পারিবারিক ব্যবসা, চাতাল, ইটভাটা, গ্যারেজ, স্থল ও নৌবন্দর, পরিবহনখাত, আসবাব তৈরি, স’মিল, কাঠমিস্ত্রী, ঝালাই, অটোমোবাইল, দোকান, হোটেল-রেস্তোরা, মৎস ও গবাদি খামার, পোল্ট্রি, প্যাকেজিং, কেমিক্যাল কারখানা, প্লাস্টিক কারখানা, ঔষধ শিল্প, স্বনিয়োজিত ইত্যাদি ধরনের ক্ষুদ্র ও মাঝারী খাত। এ ব্যাপক সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য সরকার প্রয়োজনে আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
প্রণীত নীতিমালার আলোকে সরকার হোমবেইজড শ্রমিকসহ সব অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের কল্যাণের কথা ভেবে নীতিমালা প্রণয়ন করুক, শ্রম আইনে তাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দিক।
হোমবেইজড শ্রমিকরা আত্মকর্মসংস্থান ও দারিদ্র দূরীকরণসহ জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। সঠিক নীতি ও আইন থাকলে শ্রমিকরা তাদের অধিকার ফিরে পাবেন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে আরও কার্যকর অবদান রাখতে পারবেন।

 spankbang