গাজীপুরে বেতনের আন্দোলনে পুলিশের গুলি

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার তেলিরচালায় এটিএস অ্যাপারেলস লিমিটেডের শ্রমিকদের বকেয়া বেতনের দাবির আন্দোলনে গুলি, গ্যাস ও লাঠি চালিয়েছে পুলিশ। গতকাল রবিবার দুপুরে পাঁচ শ্রমিক গুলিবিদ্ধসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে।

পুলিশ, শ্রমিক ও কারখানা সূত্রে জানা যায়, মৌচাকের তেলিরচালায় ওই পোশাক তৈরির কারখানায় প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কাজ করে। কর্মরত শ্রমিকদের এক মাসের বকেয়া ও কারখানা স্টাফদের দুই মাসের বেতন বাকি রয়েছে। এ ছাড়া গত তিন বছর ধরে শ্রমিকরা ঠিকমতো বেতন ও বার্ষিক ছুটির টাকা না পেয়ে বিজিএমইএর কাছে তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরে। সেখান থেকে প্রতি মাসের ৭ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে বেতনসহ পাওনা পরিশোধ করার জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষকে বলে দেয়। শ্রমিকরা ৭ তারিখে তাদের বকেয়া বেতন, ওভারটাইম ও ছুটির টাকা দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে জানায়। কর্তৃপক্ষ বেতন না দেওয়াতে শ্রমিকরা ৭ মার্চ থেকে কর্মবিরতি পালন করে। আগামী ১৬ মার্চ বেতন ও ২০ মার্চ ওভারটাইম, ছুটির টাকাসহ পাওনাদি পরিশোধের কথা বললে শ্রমিকরা তা মানতে রাজি হয়নি। গতকাল সকালে শ্রমিকরা কারখানায় গিয়ে বেতনের দাবিতে কাজ না করে কর্মবিরতিসহ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে। এ সময় শ্রমিকরা কারখানার ব্যবস্থাপক মাসুদের সঙ্গে কথা বলতে চায়। কিন্তু শ্রমিকদের কথা বলার সুযোগ দেয় না কর্তৃপক্ষ। এতে শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তারা গত মাসের বকেয়া বেতন, পাঁচ মাসের ছুটির টাকাসহ সব পাওনা পরিশোধ করার জন্য কারখানার ভেতরে বিক্ষোভ শুরু করে। শ্রমিকরা কারখানা থেকে বের হতে চেয়েছিল। পুলিশ তাদের বের হতে দেয়নি। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। পুলিশ শ্রমিকদের ওপর লাঠিপেটা, ১৮ রাউন্ড শটগানের গুলি, তিন রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এ সময় শ্রমিক সুমি, বেগম, রোজিনা আক্তার ও লিলিসহ পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধদের মধ্যে দুজনকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

একপর্যায়ে পুলিশ ব্যাপক লাঠিপেটা করে শ্রমিকদের কারখানা থেকে বের করে দেয়। শ্রমিকরা যাতে মহাসড়কে উঠতে না পারে সে জন্য পুলিশ তাদের কারখানা থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দেয়। ওই এলাকা তখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। শ্রমিকদের ইটপাটকেল নিক্ষেপে শিল্পপুলিশের উপপরিদর্শক সাইফুল ইসলাম, কনস্টেবল হিরা, মাহমুদা, খাদিজাসহ পাঁচজন আহত হয়। অন্যদিকে পুলিশের লাঠিপেটায় রুবেল, শিল্পী আক্তার, আসমা, স্বাধীন, রফিক জয়া, নাছিমা, শাহনাজ, মিলন, রানী, সাহিদা, আলাল, রতন, হাসিনাসহ প্রায় অর্ধশত আহত হয়। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। আশপাশের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে বিকেলে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে থাকে।

কারখানার শ্রমিক গোলাপী, সুজন, একরাম বলেন, গত ৭ তারিখ থেকে কারখানায় কর্মবিরতি চলছে। শ্রমিকরা বকেয়া বেতনসহ পাওনাদি চাইতে গেলে তারা কোনো সমাধান না করে শুধু তারিখ দেয়। শ্রমিকরা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে সুযোগ না দিয়ে পুলিশ দিয়ে নির্যাতন করে কারখানা থেকে বের করে দেওয়া হয়। শ্রমিকরা বেতনের টাকার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

কারখানার জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক রাসেদুল ইসলাম বলেন, ‘শ্রমিকদের সব অভিযোগ সঠিক নয়। তাদের প্রতি মাসে সময়মতো বেতনসহ পাওনাদি পরিশোধ করা হয়। গত মাসের বেতন চলতি মাসের ১৬ তারিখে দেওয়ার কথা। কিন্তু এতে রাজি না হয়ে কারখানায় কয়েক দিন ধরে কর্মবিরতি পালন করছে।’

শিল্প পুলিশ গাজীপুর-২-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নুর আলম বলেন, ‘গতকাল দুপুরের দিকে হঠাৎ শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং কারখানায় ক্ষতিসাধনের চেষ্টা চালায়। এ সময় পুলিশ বাধা দিতে গেলে শ্রমিকরা ইটপাটকেল ছোড়ে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেয়।’

 spankbang