চট্টগ্রামের দক্ষিণ কাট্টলি জমিদার বাড়ির কাছাকাছি বিপ্লবী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

নগরীর দক্ষিণ কাট্টলী এলাকার প্রাণ হরি দাশ সড়কের পাশেই একটি খোলা মাঠ। ফাঁকা মাঠের এক প্রান্তে দোতলা পাকা ভবনের কাঠামো রয়েছে। একতলা থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরের দিকে। কিন্তু এখনো দোতলার কাজ শেষ হয়নি পুরোপুরি। ভবনের গায়ে একটি সাইনবোর্ডে লেখা ঃ ‘সারস্বত কুটির দূর্গা মন্দির, স্থাপিত ১৩২৩ বাংলা ১৯১৬ ইং, পরিচালনায় ঃ সন্তান সম্প্রদায়, ১১ নং ওয়ার্ড, দক্ষিণ কাট্টলী।’ জমিদার প্রাণ হরি দাশের ভিটেবাড়ির কাছাকাছি নতুন ভবনটিকে ঘিরে রয়েছে অনেক ইতিহাস। জমিদার বাড়ির ছেলেরাই এখানে এক সময়ে গড়ে তোলেন তাঁতের কাপড় বোনার কারখানা–তাঁতঘর। সেখানে শুধু যে কাপড় বোনা হতো, তা নয়। সেখানে ছিল পাঠাগার, ব্যায়ামাগার, সংস্কৃতিচর্চার ব্যবস্থাও। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এই তাঁতঘরই ছিল ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার। বিপ্লবীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

এখানে আসা–যাওয়া ছিল মাস্টার দা সূর্য সেনের। তাঁতঘরের পাশে গড়ে ওঠা মাটির কুটিরে আয়োজন করা হতো সরস্বতী ও দুর্গাপূজার।
জানা যায়, স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে জমিদার স্বর্গীয় প্রাণ হরি দাশের পরিবার। তাঁর প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে তার দুই ছেলে যোগেন্দ্র লাল দাশ ও সুরেন্দ্র লাল তাঁতঘর প্রতিষ্ঠা করেন। মাস্টারদা সূর্য সেন মাঝে মাঝে আসতেন এখানে। সমুদ্রের পাড়ে অস্ত্র ও লাঠি চালনার প্রশিক্ষণ চলতো। চলতো বিপ্লবীদের গোপন সভাও। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের সব প্রস্তুতি নেয়া

হয়েছিল এই এলাকা থেকে। এলাকার বাসিন্দা শান্তি চক্রর্তীর নেতৃত্বে বিপ্লবীদের শক্ত ঘাঁটি গড়ে উঠেছিল।
জমিদার প্রাণ হরি দাশের দ্বিতীয় ছেলে খ্যাতনামা সঙ্গীতাচার্য ও সুরকার স্বর্গীয় সুরেন্দ্র লাল দাশ (চট্টগ্রামের আর্যসঙ্গীত বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাতা)। পাড়ার ছেলেদের কাছে যিনি পরিচিত ছিলেন ‘ঠাকুরদা’ নামে। তিনি স্বদেশী আন্দোলনের সময়ে দেশে তৈরি তাঁতের কাপড় পোশাক হিসেবে ব্যবহার করতেন। তাঁতের কারখানা স্থাপনের জন্য স্থানীয় আদ্যা পুকুর পাড়ে বাঁশের তৈরি একটি ঘর স্থাপন করেন। এর নাম দেয়া হয়-‘তাঁতঘর’। জমিদার প্রাণ হরি দাশের বড় ছেলে যোগেন্দ্র লাল দাশের দেয়া ৭ গ–া জমির পাশেই বাঁশের ঘরটি নির্মাণ করা হয়। জমিতে মৌসুমী সবজি উৎপাদনের বিক্রিত টাকা এবং সুরেন্দ্র লাল দাশের অনুদানে ঘরটি নির্মিত হয়। সন্তানদের এই কীর্তির জন্য নামকরণ হয় ‘সন্তান সম্প্রদায়’। এখানে গ্রামের ছেলেদেরর উৎসাহ জোগাতে এখানে একটি পাঠাগার গড়ে তোলা হয়। পাশাপাশি বাৎসরিক নাটক, গান ও ব্যায়ামের ব্যবস্থা করা হয়।
এসবের তত্ত্বাবধানে ছিলেন স্বর্গীয় অনুকুল চন্দ্র খাস্তগীর। এখানে সন্তান দল মিলে একটি মাটির কুটির নির্মাণ করে। তাতে সরস্বতী পূজার আয়োজন করা হয়। তখন এক বৈঠকে কুটিরটির নামকরণ হয় সারস্বত কুটির, সন্তান সম্প্রদায়। ঠাকুরদার পরামর্শে ও গ্রামের গুরুজনদের উপদেশ মতো সন্তানদল সমাজের বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করে সুনাম অর্জন করেন। এই ঘরেই ফতেয়াবাদ নিবাসী রামকৃষ্ণ মিশনের (আশকার দীঘির পাড়) প্রতিষ্ঠাতা দেবেন্দ্র বিজয় দাশ সন্তানদের গীতাপাঠ শিক্ষা দিতেন। তাঁর সাহচর্যে শিব চতুর্দশী মেলার সময়ে সন্তান দল স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তীর্থ যাত্রীদের সেবা করতেন। কালক্রমে সন্তানদলের দুর্গা পূজার করার ইচ্ছে থেকেই সন্তানদল সাড়ম্বরে শারদীয় দুর্গোৎসব পালন করে আসছেন। তখন সন্তানদলের ইচ্ছায় এই প্রতিষ্ঠানের পুনরায় নামকরণ হয়, সারস্বত কুটির দুর্গা মন্দির, সন্তান সম্প্রদায়। ১৯৪৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রয়াত হন ‘ঠাকুরদা’ সুরেন্দ্র লাল দাশ।
মাটির কুটিরের অস্তিত্ব ছিল এর শতবর্ষ পালন উৎসবের সময়েও। এমনটাই জানিয়েছেন ‘সারস্বত কুটির দুর্গা মন্দির’ আহবায়ক কমিটির সচিব এবং মহানগর পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রতিদ্বন্ধিতাকারী সুজিত দাশ। তাঁর কাছ থেকে জানা গেছে, গত ৫ বছর আগে থেকেই পাকা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। মাঠসহ জায়গার আয়তন হবে প্রায় ৮ গ–া। এখানে গড়ে তোলা হবে তিন তলা ভবন। এতে থাকবে মন্দির, পুরোহিতদদের বাসস্থান, দাতব্য চিকিৎসালয়, কমিউনিটি সেন্টার এবং পাঠাগার। ভবনের ওপর চূড়া নির্মিত হবে।-সৌজন্যে: দৈনিক পূর্বকোণ

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*