ঈদ আনন্দ হোক মানবিক আবেদন পুরনে

সুজিৎ কুমার বড়ুয়া
ঈদ উল ফিতর মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ও প্রধানতম ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসব ধর্মীয় রীতি-নীতি প্রতিপালনে যেমনি ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সামাজিক ব্যবস্থাপনায়ও এর ব্যাপক তাৎপর্য ও গুরুত্ব রয়েছে। রমজান মাস জুড়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা চলনে, বলনে, খাদ্য গ্রহনে, দরশনে, শয়নে, উপবেশনে কিংবা স্থিতাবস্থায় সংযমী হয়ে সাধনায় রত হয়ে স্বীয় দেহ-মন তথা চিত্তকে পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করতে ব্রতী হন এবং পূন্য সম্পদ বর্ধিত করে থাকেন। আবার যাকাত ও ফিতরা আদায় করে স্বীয় ধন সম্পদকে পবিত্র ও বৃদ্ধি সাধন করেন। ধর্মীয় দৃষ্টিকোনে রোযা রাখা, যাকাত ও ফিতরা আদায় ফরজ। সামাজিক জীবনে সাম্য প্রতিষ্ঠা, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে দুরত্ব দুর করতে যাকাত ও ফিতরা আদায় অসামান্য ভূমিকা রাখে।
ব্যাবসা-বাণিজ্য ও সার্বজনীন ক্ষেত্রেও ঈদের গুরুত্বের ব্যাপকতা রয়েছে। আমাদের এই দেশের প্রকৃতির যেমন বৈচিত্রতা রয়েছে, তেমনি সংস্কৃতিতেও বৈচিত্রতা রয়েছে । এখানে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মমতের মানুষের বসবায়। সামাজিক, অর্থনৈতিক লেনদেন ও মানসিকতার অপূর্ব মেল বন্ধনে আমরা একই জাতিসত্বা হয়েই বাস করি এই দেশে। সারা বছর ধরে নতুন বস্ত্র ক্রয়, উন্নত খাবার গ্রহন বা ভ্রমন-বিনোদনের ইচ্ছে থাকলেও তা সকলের পক্ষে সব সময় হয়ে ওঠেনা। কিন্তু ঈদ এলেই এসবের বেশীর ভাগই সকলে কম বেশী করে থাকি। এতে করে দেশের প্রায় সকলেই ব্যাবসায়িক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের আওতায় চলে আসি সকলেই। যারা বাজারে এসে কেনাকাটার সামর্থ থাকে না তারাও অবস্থা সম্পন্নদের উপার্জিত হালাল অায়ের কিয়দংশে যাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে কেনাকাটার অংশ হয়ে যান। আর ব্যাবসা কেন্দ্র গুলোতে সকল ধর্মমত ও গোষ্ঠীর লোকেরা ব্যাবসায় করে থাকেন। ঈদ উপলক্ষে মুসলিমরাই প্রধানতম ক্রেতা হলেও পন্য ক্রয়ে তাদের পছন্দের পন্য কিংবা খাবার ক্রয়ে সকলের কাছ থেকেই সদাই করে থাকেন প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে। একটি পোষাক শিল্পের মালিক, কারিগর কিংবা কর্মচারী-কর্মকর্তা যেমন মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রীষ্টান হতে পারে তেমনি যে কোন পন্যের উৎপাদক, দোকানী, দর্জি কিংবা পরিবহন মালিক ও কর্মচারী-কর্মকর্তারা যে কোন ধর্ম মতের হতে পারে এবং ঈদ কেনাকাটায় সকলের আয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে সকলের মুখেই হাসি ফোটে এবং ঈদ আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে আমাদের দেশে সকল ধর্মীয় উৎসব সমূহ সার্বজনীন হয়ে ওঠে। এইতো গেল পুরো রমজান মাস ও শাওয়াল মাসের প্রথম দিনে ঈদের নামাজ আদায়ের আগ পর্যন্ত ধর্মীয় ও সামাজিক কর্তব্য প্রতিপালনের দিক।
ঈদের নামাজ আদায় করতে ঈদগাহে যাওয়া আসার নিয়মে রয়েছে খুবই আকর্ষনীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার। ঈদের নামাজ আদায় করতে নামাজিরা একপথে যাবেন আবার নামাজ আদায় করে ফিরবেন অন্য পথ ঘুরে। এতে করে নামাজ আদায় করতে আসাদের মধ্যে শত্রু, মিত্র, আপন, পর প্রায় সকলের সাথে সাক্ষাৎ, কোলাকোলি, আলাপ ও মোবারকবাদ জানানোর সুযোগ হয়। আর প্রতিবেশীদের মধ্যে ভুল বোঝাবোঝি, মতভেদ ও শত্রুতার অবসান হয়। গড়ে ওঠে সহনশীল, সাম্য, সমতা, একতা, শৃংখলা ও সহমর্মিতার সমাজ।
ভালভাবে ধর্মীয় অনুশাসন ও রীতিনীতিগুলোকে নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর সবই বিশ্বে, রাষ্ট্রে, সমাজে, পরিবারে সর্বোপরি আত্ম শান্তি তরেই। অযথাই আমরা ধর্মের নামে সম্প্রদায় সৃষ্টি করে মানুষে মানুষে হিংসা হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে অশান্ত পরিবেশের অবতারনা করি। শুধু কি তাই, নিজ রাষ্ট্র নিয়ে সুখ পাবার আশায় ভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে আবার নিজ সমাজ নিয়ে সুখী হতে ভিন্ন সমাজ, নিজ পরিবার নিয়ে সুখী হতে প্রতিবেশীদের, নিজে সুখী হতে ভাই-বোন-আত্মীয় পরিজনের সাথে মৈত্রীর সম্পর্ক উন্নয়ন না করে ভ্রান্তির জালে জড়িয়ে হিংসা, হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে দুর্লভ মনুষ্য জন্মকে বন্য পাশবিক ও নারকীয় করে তুলে নিজেই জ্বলে নিজেরই স্বাস্থ্যহানি ও মানসিক বিকৃতি ঘটিয়ে নিঃশেষের পানে ছুটে চলি।
এবারের ঈদ ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বরাবরেই চেয়ে ভিন্ন। প্রকৃতির নিদারুন রোষে পাহাড় ধ্বসে আমরা হারিয়েছি অসংখ্য অমূল্য জীবন। স্বজন হারা পরিবার গুলোতে চলছে শোকের মাতম। রাস্তাঘাট ধ্বসে পাহাড়ী জনগোষ্ঠী ও বর্ষন প্লাবিত বিস্তীর্ণ জনপদের লক্ষ লক্ষ পরিবার অবরুদ্ধ বেশ কিছু । সেখানে খাদ্যাভাব, জ্বালানি সংকট, উপার্জনহীন, অর্থনৈতিক সংকটে মানবিক সংকট বিদ্যমান। প্রতিবারের ঈদের মত এবারও নতুন পোষাক পরব, শিশু কিশোর কিশোরীদের নতুন পোষাকে সাঁজাব। অনুজরা অগ্রজকে সালাম করবে আর অগ্রজরা ঈদ উপহার ও ঈদ সেলামি প্রদান করবে। পরিবার পরিজন ও বন্ধু বান্ধব নিয়ে ঘুরব। হয়তো নতুন কোন জায়গায় ভ্রমনেও যাব। কিন্তু একটু মানবিক হওয়ার চেষ্টাতো আমরা করতেই পারি। ঈদ আনন্দের অতিরিক্ত জৌলুসের কিছুটা কম করে হলেও যেখানে মানবিক বিপর্যয় বিদ্যমান সেইসব নতুন স্থানে গিয়ে কিছুটা সহায়তা দিয়ে দেবার আনন্দটাকে আরো বর্ধিত করে ঈদ আনন্দ উপভোগতো করাই যায়।
সকলেই নিরাপদ থাকুন, সুখী হোন, শান্তিতে থাকুন।
সকলের প্রতি রইল আগাম ঈদ মোবারক।
লেখক: সমাজ সংগঠক ও সাবেক ছাত্র নেতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

 spankbang