চট্টগ্রামে ২৯ এপ্রিল” দুঃসহ স্মৃতির বেদনার্ত অতীত”

ভয়াল ২৯ এপ্রিল। এটি কোন যুদ্ধের ইতিহাস নয়।এটি নির্মম একটি ঘূর্ণিঝড় ও করুণ প্রাকৃতিক দুর্যোগে লন্ডভন্ড প্রলয়ঙ্করী এক মহা জলোচ্ছ্বাসের দিন। প্রকৃতি তার প্রচন্ড ক্ষোভ ও বৈরিতা নিয়ে কত ভয়ন্কর আচরণ করেছিল? তা ভোক্তভোগি বা প্রত্যক্ষ্যদর্শী ছাড়া আর কারো বোধগম্য হওয়ার নয়।
গভীর রজনী। চারিদিকে ঘোর অন্ধকার। প্রচন্ড ধমকা হাওয়া,অঝোরধারায় বৃষ্টি,মেঘের বিকট গর্জনে জনজীবন হয়ে পড়ে অস্হির,অশান্ত ও ভয়ে কাতর। যতই রাত গভীর হচ্ছিল ততই জীবনের অস্হিত্ব রক্ষার সমুহ সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছিলো। কখন যে কেড়ে নিয়ে যায় জীবন প্রদীপ?
প্রাণ ওষ্ঠাগত। কুলের দূগ্ধপোষ্য মাসুম বাচ্ছা ঝড়ের ফোটার আঘাতে জর্জরিত। চারিদিকে আর্তনাদ। প্রকৃতির নির্দয় আচরণ এতই নির্মম ছিলো! হাজারো গগনবিদারী আর্তচিৎকারও তাকে একটু নমনীয় করতে পারেনি তার ভয়ঙ্কর স্বভাব থেকে ।
আহ্! কি নির্দয় ছিলো সে রাত? তা ব্যক্ত করার ক্ষমতা কারো নেই। হতবাক ও অসহায় মানুষগুলো আল্লাহ বাঁচাও,আল্লাহ বাঁচাও শব্দছাড়া বলার সব ভাষা যেন হারিয়ে ফেলেছে।
অনেক্ষণ খোলা আকাশের নিচে প্রাণে বাঁচার চেষ্টা ছিলো। নিমিষেই পরিকল্পিত আক্রমণ সবকিছু ভেঙ্গেছুড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বড়বড় দালানকোঠাও নিরাপদ রাখতে পারেনি কোন জীবন। কুলের ঘুমন্ত বাচ্ছাটাকেও নির্দয় পানি থাবা দিয়ে বুক থেকে কেড়ে নিয়ে যায়। কারো মা, কারো ছেলে,কারো বিবি বালবাচ্চা,ঘরবাড়ী,গরু ছাগল ইত্যাদি সব স্রোতস্বিনী কোথায় যে নিয়ে গেলো? আজও সেই প্রিয়জনদের হদিস পাওয়া যায়নি।
সবুজ শ্যামল ছায়াঘেরা প্রিয় জন্মভূমি অথৈ পানিতে যেন বঙ্গোপসাগর। সবুজপ্রকৃতি গাছপালা ভেঙ্গে চুরে সব যেন ভঙ্গুর মানবহীন এক জলাশয়। লাশের গন্ধ্যে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠলো।
মৃতলাশগুলো পানিতে ভাসছে। শকুন মজা করে তার আহার গ্রহণ করবে বলে ইচ্ছে করলে বেচারাও বিগলিত দূর্গন্ধে পাশে যেতে ভয় করলো। সব এলোমেলো।
লাশ দাপন করবে কে? সেদিন ফেরেস্তারা কোন ভূমিকা রেখেছিল কিনা জানিনা? তবে অবস্তাদৃষ্টে মনে হলো হয়তো সেদিন আর কোন প্রাণীর অস্হিত্ব নেই। সেদিনের বিভৎসরুপ আর ধ্বংসযজ্ঞ যারা দেখেছিল, তাদের এখনো মনে পড়লে চোখের অশ্রু সংবরন করতে পারেনা।
ঘরনেই বাড়ী নেই। মুষ্টিমেয় শক্তিমানব আল্লাহর ইচ্ছায় বেঁচে গেলেও ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দেহ, পরনে কাপড় নেই,পেটে ভাত নেই, তৃঞ্চায় পানি নেই, বিশ্রামের জায়গা নেই,লাশের গন্ধে ও স্বজন খোঁজে না পাওয়ার বেদনায় তারাও কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
সেদিন হারানোর যেন আর কিছুই ছিলনা। ভয়াল প্রলয়ঙ্করী এই ঘুর্ণিঝড় মানবজীবনের সবকিছু কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব জনপদে একাকী যেন ফেলে রেখে যায়। কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল শুকিয়ে গেল। আর দেখা হলোনা হারানো স্বজনদের সাথে।
এখনো একা, বড্ড একা,দুঃসহ সেই ভয়াবহ স্মৃতি বিবেককে এখনো স্তব্ধ করে দেয়।
আজকের এইদিনে বারবার চোখে ভাসছে ক্ষতবিক্ষত সেই স্মৃতিগুলো। মনেই পড়েনা কিভাবে ফিরে এলো বেঁচে থাকার স্বপ্নের স্তম্ভিত ঠিকানা?নতুন জীবনে নতুন করে সাজানোর গল্প।

প্রলয়ঙ্করী ঘুর্ণিঝড় সেদিন আমাদের যা ক্ষতি করেছে তা নিয়ে আজকে আর কোন অভিযোগ নয়,, অভিযোগ তো শুধু একটাই-
সব কেড়ে নিল আমার বৃদ্ধ মা কে কেন কেড়ে নিল? আমার কলিজার টুকরো মাসুম ছেলেটিকে কেন ছিনিয়ে নিল? তাদের লাশের সাথেও দেখা করে শান্তনা জানানোর কেন সুযোগ দিলনা?
এ ব্যাথা কখনো সয়বার নয়। নির্মম এই দিনটি যখনি মনে পড়ে হৃদয় জগতকে ভেঙ্গেচুরে চুরমার করে দেয়। বেদনার্ত ভাঙ্গা এই মন শান্তনার অমীয় বাণী আর শুনতে চায়না। ঘুরেফিরে এখনো খুঁজে বেড়ায় প্রিয় স্বজনদের এক নজর দেখতে। লেখকঃ জয়নাল

 spankbang